“ওর কথা ভেবে”
সকাল সাড়ে আঁটটার
পর বাড়িটা বড্ড ফাঁকা হয়ে যায়, আজও সেই একই ব্যাপার, রুমির স্কুল আর সুশোভন এর
অফিস। দুজনেই আসবে সেই বিকেলে। কি করি কি করি ভাবতে ভাবতে সুতনুকা ড্রেসিং টেবিল
এর সামনে দাঁড়িয়ে ওর লম্বা ঘন চুলে অলসভাবে হাত বোলাচ্ছিল! নিজের দিকে চোখ পড়ল হঠাৎ,মনে
পরে গেল গত রবিবার এ ডোনা দের বাড়ির অ্যানিভারসারি পার্টি র কথা, কত লোকের চোখের
নির্বাক কুরনিস, মলি তো বলেই ফেলল, “ সত্যি তনু, কি জাদুমন্ত্রে নিজেকে এমন রেখেছিস বলত?” ভাবতেই
হেসে ফেলল সুতনুকা, “আমি? আর রুপচরচা? সময় কোথায়? সংসার থেকে ফুরসৎ পেলে ত? আর ভাল
লাগে না, মেয়ে বড় হছছে, তার সামনে ছোটটি সেজে ঘুরে বেড়ান? ওসব পোষায় না বাবা!!”
সেদিনও ত মেয়ের স্কুল এর ফাংশান এ কে যেন বলল, “রীতিকা, ইনি কে রে? তোর দিদি?”
রুমি কেমন থতমত খেয়ে বিশাল দুটো অবাক চোখ করে বলল, “ এমা! ধ্যাত্, দিদি কেন হবে, আমার
মা তো” এইসব ছোটছোট ঝলক গুলো মাঝে মাঝে শুনে হেসে ফেলে আর ভাবে,এগুলো কি উপভোগ্য
মুহূর্ত না মেকি মতামত?
এই সব ভাবতে
ভাবতে বসার ঘরে চলে এল সুতনুকা, দেয়ালে টাঙানো ওর ১৮-১৯ বছর এর একটা ছবি, ছিপছিপে
তরুনি, কলেজ সোশ্যাল এর নাচের ছবি, ডীপ ব্লু রঙের ভারতনাটায়াম এর পোশাক এ ওকে আরও
মোহমোয়ী লাগছে। সুশোভন এর কীর্তি, দেয়ালে টাঙ্গিয়ে রেখছে, কি যে ভাল লাগে কে জানে,
বলে কিনা “ এটা হল আমার প্রাইড!!” (খালি তেল লাগান)।
একমনে ছবিটা
দেখতে দেখতে হঠাৎ মনে পরে গেল “আরে! পরের
রবিবার ত সেই দিন, যেদিন ও আসছে!! বিদ্যুৎ এর মত একটা তীব্র ঠাণ্ডা স্রোত নেমে গেল
ওর শিরদাঁড়া বেয়ে, কি হবে, কি করবে, কেউ তো জানেনা ওর আসল পরিচয়, কি জবাব দেবে
সবাইকে যখন সবাই জানতে পারবে ? উফ্, ভাবতেই হাত-পা ঠাণ্ডা হয়ে এল সুতনুকার, বেশ তো
ছিলাম, এতগুলো বছর, হঠাৎ কি প্রয়োজন ছিল এই দিনটার ওর জীবনে আসার!
মনে পড়ল সবার
প্রথম রুমির কথা, ওর তো কোন আইডিয়াই নেই “ওর” সম্বন্ধে, কি জবাব দেবে যখন ও জানতে পারবে মা এতদিন ওর কাছে লুকিয়ে রেখেছিলো ।
সুশোভন এর মুখটার অভিবা্ক্তি নিশ্চয় বদলে যাবে, কোথাও পার্টি তে সেজেগুজে বেরোলে ওর
সেই প্রেমিক প্রেমিক দৃষ্টিটা আর দেবে না, হয়ত বলবে “তুমিও ত সবার থেকে আর আলাদা
রাখতে পারলে না নিজেকে তনু”।
স্বাতীর কথা মনে
পড়তে সবচেয়ে বেশি খারাপ লাগল তনুর। ও হয়ত বলবে, “ জানতাম তুই আমার সবচেয়ে কাছের
বন্ধু তনু, তুইও আমাকে লুকলি?”
এইসব মনে আস্তে
হাতে আর কোনও কাজ পড়ল না তনুর, কিছুই ভাল লাগল না, মাঝে মাত্র আর তিনদিন! কি করে ওর
আসাটা আটকাবে? সেই কলেজ জীবনে ত ফিরে যাওয়া যায় না এখন, আনেকগুলো বছর কেটে গেছে, ঠিক করল
নিজেকে ঘরবন্দি করে রেখে দূরে সরিয়ে রাখবে, ও আসছে কিনা ফলে কেউ টের ও পাবেনা।
তিনদিন যেন তিন
যুগের মত কাটল সুতনুকার!
অবশেষে এল
রবিবার, উফ্ সকাল থেকে কেমন যেন ঘোরের মধ্যে আছে ও, সুশোভন এর সাথে ব্রেকফাসট্ টেবিল এ বসে
চোখে চোখ পড়তেই কেমন ষেন মুচকি হাসল ও,(তবে কি ও জেনে গেল যে আজ), হঠাৎ মেয়ে বলল,
“মা, আমার আস্তে দেরি হবে আজ,অঙ্কের এক্সট্রা লেসেন আছে”। হাঁ, না কিছুই বলল না
তনু, মনটা বড় চঞ্চল, কখন সন্ধ্যে হবে? সুশোভন এর লাঞ্চ প্যাক করতে গিয়ে আনেক কিছু
হাবি-জাবি দিয়ে দিল যার কোনটাই ও খায়না।
ঠিক সাড়ে-পাঁচটা
নাগাদ একটু তন্দ্রা মত এসেছিল, এমন সময় ফোন টা বেজে উঠল ঝনঝন করে,ওপাশে ভারি গলা,
“আর আধঘণ্টার মধ্যে আসছি, তুমি রেডি তো?” কি করবে কি না করবে বুঝে উঠতে পারল না,
কি সাড়ী আর কি গয়না পরবে যাতে ওকে সবচেয়ে সুন্দর লাগে। মোটামুটি সাজার একটুর
মধ্যেই বেল বাজল।
দরজা খুলতেই একটা
সমবেত আওয়াজ সুনল, “Happy Birthday তনু, মা Happy Birthday”। এক মুহূর্তের মধ্যে পা আটকে যেতে যেতে ও দেখল পেছনে রীতিকার
বান্ধবি্রা, স্বাতি, পাশের বাড়ির সুনন্দা-সায়ক,উফ্, কে নেই?
সবাই বলল, “SURPRISE!!! আমরা এমন একটা দিনে পার্টি না করে থাকতে
পারি? তোর ৪০তম জন্মদিন বলে কথা! Anyway..you
look awesome, are you really….?”
ঘাম দিয়ে জ্বর ছেড়ে গেল তনুর, নাঃ! তাহলে এখনো
ও আসেনি, যাকে ওর সবচেয়ে ভয় করে, “বাধক্য!!”, তবে যদিও জানে একদিন ও এসে দাঁড়াবেই,
ওকে থামানো জাবেনা। কালের নিয়ম এ ও আসবেই।
রুমি এল একগোছা গোলাপ আর একটা গিফট্ নিয়ে, গলা
জড়িয়ে বলল, “মা তোমার ৪০ তম জন্মদিনে আমার উপহার, খুলবে না?”
তনু বলল, “তুই ত আমার সবচেয়ে বড় উপহার, আর কি
চাই বল?”
হৈহৈ করে কেক্ কাটল সবার
সাথে, মন্ টা ভাল হয়ে গেল তনুর,কানে এল সুশোভন এর মন্তব্য, “ you can still."